মাছের বর্জ্য থেকে সম্পদ: আইসিএআর-সিবা-এর জৈবসার কৃষি
বিশ্ব সমাচার,কাকদ্বীপ: দেশের কৃষি ও মৎস্যচাষে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং মাছের বর্জ্যের পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে আইসিএআর-কেন্দ্রীয় নোনা জলজীব পালন অনুসন্ধান সংস্থার (সিবা) কাকদ্বীপ গবেষণা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটি মাছের বর্জ্য থেকে উদ্ভাবন করেছে দুটি জৈব সার— সিবা-প্ল্যাঙ্কটনপ্লাস এবং সিবা-হর্টিপ্লাস, যা কৃষি ও মৎস্যচাষে টেকসই উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
ভারতে বর্তমানে বছরে প্রায় ১৯৫ লক্ষ টন মাছ উৎপাদিত হয়, যার ফলে ৬০ লক্ষ টনেরও বেশি মাছের বর্জ্য সৃষ্টি হয়। এই বিপুল বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে প্রতিবছর প্রায় ৪৮ লক্ষ টন প্ল্যাঙ্কটনপ্লাস এবং ৩ লক্ষ টন হর্টিপ্লাস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
আইসিএআর-সিবার পরিচালক ড. কুলদীপ কে. লাল জানান, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাট, কেরালা, তামিলনাড়ু ও ওড়িশার বিভিন্ন খামারে পরিচালিত পরীক্ষায় সিবা-প্ল্যাঙ্কটনপ্লাসের অসাধারণ কার্যকারিতা প্রমাণিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মৎস্যচাষে প্ল্যাঙ্কটনপ্লাস ব্যবহারের মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি গড়ে ৪০০ কেজি অতিরিক্ত মাছ ও চিংড়ি উৎপাদন সম্ভব। দেশের ১২.৩ মিলিয়ন হেক্টর সম্ভাব্য জলচাষ এলাকায় এর প্রয়োগ অতিরিক্ত ৪৯.২ লক্ষ টন মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনে সহায়তা করতে পারে। পোনা মাছের চাষে এটি হেক্টরপ্রতি ১৪০ কেজি ইউরিয়া এবং ৫০ কেজি একক সুপার ফসফেট সারের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি খাদ্য ব্যয়ও প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।
কৃষিক্ষেত্রেও এই জৈব সারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য লক্ষ্য করা গেছে। ধান চাষে প্ল্যাঙ্কটনপ্লাস স্প্রে করার ফলে হেক্টরপ্রতি প্রায় ৭৫ কেজি ইউরিয়ার ব্যবহার কমানো সম্ভব হয়েছে, অথচ ফলনের কোনো হ্রাস ঘটেনি। বরং বিভিন্ন সবজি ফসলে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
অন্যদিকে, সিবা-হর্টিপ্লাস মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং আলু চাষে ৫ থেকে ২৩.৮ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। এটি হেক্টরপ্রতি ১০০–১৫০ কেজি ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সারের কার্যকর বিকল্প হিসেবেও প্রমাণিত হয়েছে।
এই উদ্ভাবনের নেতৃত্বদানকারী প্রধান বিজ্ঞানী এবং কাকদ্বীপ গবেষণা কেন্দ্রের অধ্যক্ষ ড. দেবাশিস দে উল্লেখ করেন, মাছের বর্জ্যভিত্তিক এই জৈব সার শুধু পরিবেশ দূষণ কমাবে না, বরং কৃষকদের উৎপাদন খরচ হ্রাস, মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং টেকসই কৃষি ও মৎস্যচাষ ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশের প্রাকৃতিক কৃষি আন্দোলন ও জৈব উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই প্রযুক্তি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই প্রযুক্তিকে তৃণমূল স্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আইসিএআর-সিবা উপকূলীয় অঞ্চলের মৎস্যজীবী স্বনির্ভর গোষ্ঠী, মৎস্যচাষি উৎপাদক সংস্থা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু এবং মহারাষ্ট্রসহ একাধিক রাজ্যে ইতোমধ্যে উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে মাছের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটিয়ে স্বচ্ছ ভারত অভিযান-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নেও সহায়তা করছে।
উল্লেখ্য, মহারাষ্ট্র সরকার ইতোমধ্যে “প্ল্যাঙ্কটনপ্লাস ও হর্টিপ্লাস উৎপাদনের জন্য মাছের বর্জ্য পুনর্ব্যবহার প্রকল্প”-কে মুখ্যমন্ত্রী মৎস্যসম্পদ যোজনা-র আওতায় অনুমোদন দিয়েছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে ৭৫ শতাংশ আর্থিক সহায়তা প্রদান করছে।
বর্তমানে প্রাকৃতিক চাষাবাদ, টেকসই কৃষি এবং চক্রাকার জৈব অর্থনীতি মডেলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সেই প্রেক্ষাপটে সিবা-প্ল্যাঙ্কটনপ্লাস এবং সিবা-হর্টিপ্লাসের মতো মাছের বর্জ্যভিত্তিক জৈবসার রাসায়নিক সারের আমদানি কমাতে এবং ভারতের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্ভাবন ভারতের কৃষি ও মৎস্যখাতে আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ‘বর্জ্য থেকে সম্পদ’ সৃষ্টির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।