রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান চায় বাংলাদেশ
ঢাকা (বাংলাদেশ) থেকে বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ায় দেশের পরিবেশ, সামাজিক পরিস্থিতি ও অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়ছে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও সমন্বিত ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর হোটেল শেরাটনে গত ২৩ আগস্ট ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) আয়োজিত ‘কনফ্লুয়েন্স ২০২৬: আ কনভেনিং অব পার্টনারশিপ, অ্যাপ্রিসিয়েশন অ্যান্ড কমিটমেন্ট’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানানো হয়। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ব্যাপকভাবে আগমনের নয় বছর পূর্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী এই শরণার্থী সংকটের আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে আলোচনা করতে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ওপর অর্থবহ চাপ সৃষ্টি করাও প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনসহ রোহিঙ্গাদের জন্য অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে এই সংকটের বোঝা বহনে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। রোহিঙ্গা সংকটকে কোনোভাবেই একটি বিস্মৃত সংকটে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে দেশের বৈদেশিক নীতির অন্যতম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করেছে। শুধু মানবিক সহায়তার মাধ্যমে সংকটটি পরিচালনা নয়, বরং এর একটি টেকসই ও স্থায়ী সমাধান অর্জনে সরকার দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আইআরসির এশিয়া অঞ্চলের উপ-আঞ্চলিক পরিচালক হাসিনা রহমান বলেন, এই মানবিক সংকটের নয় বছর পার হয়ে গেছে। গতানুগতিক পদ্ধতিতে আগামী দিনগুলোতে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। মানবিক সহায়তার জন্য তহবিল কমে আসছে এবং বিশ্বের মনোযোগও ধীরে ধীরে অন্য সংকটের দিকে সরে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সম্মিলিতভাবে নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। সংকটের টেকসই সমাধানের পাশাপাশি সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রোহিঙ্গা মানবাধিকার কর্মী লাকি করিম বলেন, যেকোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর আগে মিয়ানমারের রাখাইনে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও টেকসই জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে মানবিক সহায়তার ওপর তাদের নির্ভরশীলতা কমবে এবং তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। অনুষ্ঠানে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সরকার, দাতা সংস্থা, মানবিক কার্যক্রমে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাবিদরা রোহিঙ্গা সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন, এনজিও-বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (সচিব) ড. মোহাম্মদ জাকারিয়া, শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশনাল ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসমে, অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন বাংলাদেশের কর্মকর্তা হামাহ হোসেন এবং আইআরসি বাংলাদেশের অ্যাক্টিং কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ রিয়াসসহ অন্যরা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আইআরসির রিজিওনাল অ্যাডভোকেসি স্পেশালিস্ট সাবিরা সুলতানা নূপুর। এতে বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধি, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, দেশি ও আন্তর্জাতিক এনজিও, শিক্ষাবিদ এবং রোহিঙ্গা সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।