এডমুন্ডের হ্যাটট্রিক, ২২ বছর পর ডুরান্ড ইস্টবেঙ্গলের

Aug 24, 2026 - 11:41
 3
এডমুন্ডের হ্যাটট্রিক, ২২ বছর পর ডুরান্ড ইস্টবেঙ্গলের

২২ বছর পর ডুরান্ড ইস্টবেঙ্গলের। ২০০৪ সালের পর ২০২৬। কলকাতায় প্রথম। মোট ১৭ বার। ছুঁয়ে ফেলল মোহনবাগানকে। ম্যাচের বয়স মাত্র ২২ মিনিট। স্কোরবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে ৩-০। যুবভারতী লাল হলুদের দখলে। ২২ মিনিটের ঝড়ে ডুবল পালতোলা নৌকা। শেষ কোন ডার্বিতে শুরুতেই এমন স্কোরলাইন হয়েছে জানা নেই। কিন্তু আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের মাস্টারস্ট্রোকে লাল হলুদে বসন্ত। নব্বই মিনিটের শেষে স্কোরলাইন ৪-১। এদিন ফিরতে পারত ১৯৭৫ সাল। পাঁচ গোলের লজ্জার হাত থেকে কোনওক্রমে বাঁচল মোহনবাগান। ২০১৬ সালের পর ডার্বিতে মোহনবাগানকে চার গোল ইস্টবেঙ্গলের। সেবার বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্যের কোচিংয়ে কলকাতা লিগের ম্যাচে ৪-০ গোলে জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল। জোড়া গোল ছিল ডু ডংয়ের। মাঝের সময়টা মোহনবাগানের। ডার্বিতে জয়জয়কার। এক দশক পর আবার চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। প্রথমে আইএসএল, এবার ডুরান্ড কাপ। ট্রফি দিয়ে মরশুম শেষ করার পর ট্রফি দিয়েই শুরু। মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের বিরুদ্ধে চতুর্থ ডার্বি জয় ইস্টবেঙ্গলের। আগাগোড়াই আধিপত্য ইস্টবেঙ্গলের। প্রথমার্ধে দাঁড়াতেই পারেনি সবুজ মেরুন। জঘন্য ফুটবল। প্রথমার্ধেই পাঁচ গোল। ইস্টবেঙ্গল এগিয়ে যায় ৪-১ গোলে। প্রথম ৪৫ মিনিটেই হ্যাটট্রিক এডমুন্ড লালরিনডিকার। ডার্বির ইতিহাসে প্রথমার্ধে পাঁচ গোল হয়নি। হয়নি হ্যাটট্রিকও। কিন্তু এদিন ৪৪ মিনিটে নিজের তৃতীয় এবং দলের চতুর্থ গোল করেন মিজোরামের ২৭ বছরের মিডফিল্ডার। গতবছর ডার্বিতে গোল করেছিলেন। তবে সেই ম্যাচ ১-১ গোলে শেষ হয়। কিন্তু রবিবাসরীয় যুবভারতীতে এডমুন্ড ঝড়ে তছনছ সবুজ মেরুন। দুরন্ত গতি দিয়ে ছিটকে দেয় বাগানের ডিফেন্ডারদের। লকগেট খোলেন বিপিন সিং। বাকি তিন গোল এডমুন্ডের। ম্যাচের ১২, ২২ এবং ৪৪ মিনিটের গোলে হ্যাটট্রিক সম্পন্ন। গ্যালারিতে জ্বলল মশাল। বাইচুং ভুটিয়া, এডে চিডি, কিয়ান নাসিরিদের তালিকায় নাম লেখালেন এডমুন্ড লালরিনডিকা। ভারতীয় হিসেবে তৃতীয়। ডার্বিতে প্রথমার্ধে হ্যাটট্রিক এই প্রথম। হাবাসের মগজাস্ত্রে বাজিমাত। দুই দলের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেন স্প্যানিশ কোচ। লাল হলুদের হটসিটে ডার্বি দিয়ে অভিষেক হয় হাবাসের। কিন্তু তার আগে মাত্র দু'দিন অনুশীলনের সুযোগ পাওয়ায় রেজাল্ট তাঁর বিরুদ্ধে যায়। সাহাল আব্দুল সামাদের একমাত্র গোলে ডার্বি জেতে মোহনবাগান। কিন্তু ফাইনালে হাবাস ফিরলেন হাবাসে। ডার্বির আগের দিন প্র্যাকটিস রাখেননি। গুরুত্ব দেন মানসিক প্রস্তুতিকে। রবিবার পাঁচ রক্ষণে দল সাজান। বাঁ দিকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন জয় গুপ্ত। শুরুতে বিপক্ষকে মেপে আক্রমণে যাওয়ার ছক কষেছিলেন হাবাস। কিন্তু প্যানাগিওটিস ডিলেমপেরিসের ভুলে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি ইস্টবেঙ্গলকে। প্রথমার্ধে বাগানকে নিয়ে ছেলেখেলা লাল হলুদের। দ্বিতীয়ার্ধে কোনও গোল হয়নি। ঝাঁপি বন্ধ করে দেন হাবাস। ম্যাকলারেন, মনবীররা চেষ্টা করেও ব্যবধান কমাতে পারেনি। চার গোলের পর ম্যাচে ফেরার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কমতে পারত ব্যবধান। সেটাও পারল না প্যানোসের দল। মোহনবাগানের আত্মসমর্পণের দুটো কারণ।এক, ক্লান্তি। দুই,প্যানোসের ভুল স্ট্র্যাটেজি। সেমিফাইনাল খেলতে শিলং যেতে হয় মোহনবাগানকে। ফেরার সময় বিমান সমস্যায় পাঁচ দফায় ফিরতে হয়। শেষ গ্রুপ কলকাতায় পৌঁছয় শুক্রবার রাত আটটায়। বিশ্রামের কোনও সুযোগ নেই। একদিনের প্র্যাকটিসে নামতে হয় ফাইনালে। সবুজ মেরুন ফুটবলারদের শরীরীভাষায় ক্লান্তি স্পষ্ট। মাঠে হেঁটে বেড়ান অনেকেই। খেলায় সেই ঝাঁঝ ছিল না। প্রথম থেকেই একটা গাছাড়া মনোভাব। তবে ইস্টবেঙ্গলকে কোনওভাবে খাটো করা যাবে না। প্রথম ৫ মিনিট আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করে মোহনবাগান। বাকি সময়টা লাল হলুদের ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। মাঝমাঠ, রক্ষণ নেই। রশিদ, বিপন, এডমুন্ডদের খেলার জায়গা তৈরি করে দেয় বাগানের মাঝমাঠ। চলতি মরশুমে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে ছন্দে থাকা ফুটবলার সাহালকে প্রথম একাদশে রাখেননি প্যানোস। তাঁর জায়গায় নামান ম্যাকলারেনকে। এই ভুলের খেসারত দিতে হল। মাঝমাঠে জঘন্য জেলকোভিচ। কার্যত বাগানের মাঝমাঠ বলে কিছু ছিল না। অন্যদিকে, লাল হলুদের মাঝমাঠে অনবদ্য মহম্মদ রশিদ। ম্যাচের রিং মাস্টার প্যালেস্টাইনের ফুটবলার। এটাই পার্থক্য গড়ে দেয়। ম্যাচের ১০ মিনিটে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। রশিদের পাস থেকে ১-০ করেন বিপিন সিং। তার দু'মিনিটের মধ্যে ২-০। জিকসনের পাস থেকে বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের দূরপাল্লার শটে নিজের প্রথম গোল করেন এডমুন্ড। ম্যাচের ২২ মিনিটে তৃতীয় গোল ইস্টবেঙ্গলের। এটাই এডমুন্ডের সেরা গোল। রাহুল বেকেকে কাটিয়ে বিশাল কাইতকে পরাস্ত করে গোলে রাখেন লাল হলুদের মিডিও। তিন গোলে এগিয়ে যাওয়ায় জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। তবে লড়াই ছাড়েনি মোহনবাগান। ম্যাচের ৩৪ মিনিটে ব্যবধান কমায়। গোল করেন মনবীর সিং। কিন্তু সবুজ মেরুন ম্যাচে ফেরার আগেই ৪-১। হ্যাটট্রিক এডমুন্ডের। রশিদের ফ্রিকিক থেকে জয় গুপ্তর মাইনাস। তেকাঠিতে রাখতে ভুল করেননি এডমুন্ড। প্রথমার্ধে ব্যবধান কমানোর সুযোগ পেয়েছিলেন ম্যাকলারেন। কিন্তু জোড়া সুযোগ নষ্ট। ৩৭ মিনিটে নিশ্চিত গোল মিস বিশ্বকাপারের। মনবীরের পাসে পা ছোঁয়ালেই গোল। কিন্তু মিস করেন। এখনও পুরো ম্যাচ ফিট নয় ম্যাকলারেন। তার আগে জোড়া সুযোগ নষ্ট লিস্টন কোলাসোর। একবার তাঁর ফ্রিকিক বাঁচান গিল। দ্বিতীয়ার্ধে আরও একবার পরিত্রাতা ইস্টবেঙ্গলের গোলকিপার। বিরতির পর ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ ছিল লাল হলুদের সামনে। পাঁচ গোল করতে পারত ইস্টবেঙ্গল। ম্যাচের ৬৫ মিনিটে বিপিনের শট বাঁচান বিশাল। ম্যাচের ৭২ মিনিটে একের বিরুদ্ধে এক পরিস্থিতিতে মিস পরবর্ত ফুটবলার জেসিনের। ১৯৭৫ সালের ইতিহাস ফেরাতে না পারলেও সমর্থকদের মন জয় করে নিলেন হাবাস।