বাংলাদেশের চিংড়ি: অর্থনীতির নীরব শক্তি

Aug 13, 2026 - 10:53
Aug 13, 2026 - 11:28
 9
বাংলাদেশের চিংড়ি: অর্থনীতির নীরব শক্তি

মিজান রহমান, বরিশাল, বাংলাদেশ: চিংড়ি চাষ এখানে শুধু মাছ উৎপাদনের একটি পদ্ধতি নয়; এটি বহু পরিবারের আয়-রোজগার ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চিংড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী মাছ। দেশে যেমন এর চাহিদা রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চিংড়ির পরিচিতি ব্যাপক। বিশেষ করে বাগদা ও গলদা চিংড়ি দেশের মৎস্য রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সম্ভাবনার পাশাপাশি এ খাতে রয়েছে নানা সমস্যা—রোগব্যাধি, মানসম্মত পোনার সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জে সম্প্রতি চিংড়ির কয়েকটি ঘের সরেজমিনে পরিদর্শনের সুযোগ হয় এ প্রতিবেদকের। ঘেরের পানিতে চিংড়ির বিচরণ, চাষিদের ব্যস্ততা এবং উৎপাদন ঘিরে তাদের নানা আশা-নিরাশা কাছ থেকে দেখার পাশাপাশি কথা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের চিংড়ি চাষিদের সাথে। বাংলাদেশের বাগেরহাট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জেলা-ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটে ২৩ হাজার ২৫৮ হেক্টর জমিতে ৫৪ হাজার ৮৪৮টি গলদা ঘেরে উৎপাদন হয়েছে ৩২ হাজার ৬৩০.৯৫ মেট্রিক টন চিংড়ি। একই সঙ্গে রুই, কাতলা, মৃগেল, পুঁটিসহ বিভিন্ন সাদা মাছও উৎপাদিত হয়েছে ১২ হাজার ৯১৪.২১ মেট্রিক টন। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে বাগেরহাট সদর, চিতলমারী, মোল্লাহাট ও ফকিরহাটে গলদা উৎপাদনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। মোড়েলগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে চিংড়ি চাষ হয়ে আসছে। মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, অনেক কৃষক ধান চাষ পরিহার করে ঘেরভিত্তিক মাছ চাষের মাধ্যমে বেশি আয় করার চেষ্টা করছেন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, সুস্থ ও সবল পিএল বা চিংড়ির পোনা ১ থেকে দেড় মাস নার্সিং করে ঘেরে ছাড়লে বেঁচে থাকার হার বাড়ে। একই আকার, বয়স ও জাতের পোনা একসঙ্গে ছাড়ার পাশাপাশি ঘেরে পর্যাপ্ত আশ্রয়স্থল রাখা হলে গলদার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে। ঘেরের গভীরতা যৌক্তিক রাখা গেলে পানির তাপমাত্রা ও গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। অনুকূল পরিবেশে প্রায় ছয় মাসের ব্যবস্থাপনায় বিক্রয়যোগ্য আকারের গলদা পাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষুদ্র চাষি পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও কারিগরি পরামর্শের অভাবে সরাসরি দুর্বল পোনা ঘেরে ছাড়েন। এতে পোনার মৃত্যুহার বাড়ে এবং কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাওয়া যায় না চিংড়ি চাষে রোগব্যাধি সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি। বিশেষ করে বাগদা চিংড়িতে হোয়াইট স্পটসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিলে অল্প সময়ের মধ্যে ঘেরের বড় অংশের চিংড়ি মারা যেতে পারে। আক্রান্ত পোনা, দূষিত পানি, কাঁকড়া, বন্য চিংড়ি ও এক ঘের থেকে অন্য ঘেরে পানি চলাচলের মাধ্যমেও রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই রোগমুক্ত ও স্বাস্থ্যসম্মত পোনা সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। হ্যাচারি পর্যায়ে রোগ পরীক্ষা, পোনার স্বাস্থ্যসনদ এবং চাষিদের পোনা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ বাড়ানো দরকার। চাষিরা যাতে রোগের প্রাথমিক লক্ষণ বুঝতে পারেন এবং দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন, সে ব্যবস্থাও মাঠপর্যায়ে জোরদার করা প্রয়োজন। জিউধারার মাছচাষি সবুজ হাওলাদার বলেন, চিংড়ির পোনা, খাদ্য, চুন, জিওলাইট, প্রোবায়োটিক, ওষুধ, শ্রম, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও পরিবহন—সবকিছুর ব্যয় বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। অন্যদিকে চাষিরা সব সময় উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম পান না। চিংড়ি রপ্তানিকারকের কাছে পৌঁছানোর আগে ফড়িয়া, স্থানীয় ব্যবসায়ী, আড়তদার, ডিপো ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাসহ একাধিক স্তর অতিক্রম করে। ফলে চাষির দর-কষাকষির ক্ষমতা কম থাকে। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে চাষিরা পর্যাপ্ত তথ্য পান না। মোড়েলগঞ্জের মতো এলাকায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি আব্দুর রহমান বলেন, ২০২৬ সালে এসে দেখছি এর পরিস্থিতি আরও কঠিন। তাই সরাসরি চাষি-কারখানা ক্রয়ব্যবস্থা, স্বচ্ছ গ্রেডিং ও ডিজিটাল ওজন ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। কোন কোন চাষি বলেন, ধান ও চিংড়ি—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য দরকার। চিংড়ি চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে আয় বাড়ালেও অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমিতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করানো হলে ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটির লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট ও পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা অতিব জরুরী। তাই সব কৃষিজমিকে চিংড়ি ঘেরে পরিণত করার পরিবর্তে উপযুক্ত এলাকা নির্ধারণ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত নিয়ম মেনে চিংড়ি চাষের সম্প্রসারণ প্রয়োজন। চিংড়ি, ধান ও সব্জি তিন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে ভারসাম্য তৈরি করা গেলে কৃষকের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা দুটিই রক্ষা করা সম্ভব। বাগেরহাট জেলা সাংবাদিক মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ একসময় হিমায়িত চিংড়ির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করত। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ইকুয়েডর, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে কম খরচে উৎপাদনের কারণে বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি মূল্য প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৩ হাজার ৯৬৩.১১ টন বাগদা চিংড়ি রপ্তানি করে প্রায় ১ হাজার ৬৯১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আয় করেছে। গত অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি ও আয় উভয় ক্ষেত্রেই উন্নতি হয়েছে। আগামী অর্থবছরেও (২০২৬-২০২৭) চিংড়ি চাষের আরো সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। তবে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু কাঁচা বা হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানি যথেষ্ট নয়। রেডি-টু-কুক, মেরিনেটেড, ব্রেডেড, ভ্যাকুয়াম-প্যাকড ও রিটেইল প্যাকজাত চিংড়ির মতো মূল্যসংযোজিত পণ্য তৈরি করা প্রয়োজন। ইউরোপের পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও প্রবেশ আরো বাড়াতে হবে। চিংড়ি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মাঠপর্যায়ের চাষিদের পাশে দাঁড়ানো। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পানি পরীক্ষার সুবিধা, রোগ নির্ণয়, মানসম্মত পোনা সরবরাহ এবং কারিগরি পরামর্শ নিশ্চিত করা দরকার। ক্ষুদ্র চাষিদের জন্য স্বল্পসুদের ঋণ ও চিংড়ি বীমা চালু করা যেতে পারে। রোগ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা আকস্মিক উৎপাদন ক্ষতির ক্ষেত্রে বীমা চাষিকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। চাষিদের সমবায় বা ক্লাস্টারের আওতায় এনে সরাসরি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তারা উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো বিশেষ করে বাগেরহাটের ঘেরগুলোতে সরেজমিনে ঘুরে যে চিত্র পাওয়া যায়, তাতে চিংড়ি চাষের সম্ভাবনা যেমন স্পষ্ট, তেমনি সমস্যাগুলোও চোখে পড়ার মতো। সঠিক পোনা, আধুনিক চাষপদ্ধতি, রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ, সহজ ঋণ এবং ন্যায্য বাজার নিশ্চিত করা গেলে চিংড়ি চাষ বহু পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। চিংড়ি শুধু একটি মাছ নয়—এটি উপকূলীয় অর্থনীতির একটি বড় চালিকাশক্তি। চাষি থেকে শুরু করে পোনা উৎপাদনকারী, খাদ্য ব্যবসায়ী, শ্রমিক, পরিবহন, বরফকল, আড়ত, ডিপো, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও রপ্তানিকারক—বিস্তৃত একটি জনগোষ্ঠী এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। তাই চিংড়ির ঘের থেকে দেশের রপ্তানি বাজার পর্যন্ত একটি বিষয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—চাষির উৎপাদন বাড়াতে হবে, উৎপাদন খরচ কমাতে হবে এবং তার ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই চিংড়ি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরও বড় অবদান রাখার পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের জীবনেও আনতে পারে স্থায়ী স্বচ্ছলতা।