হাজার টাকায় জীবন বাজি! বাঘ তাড়ান, মানুষ বাঁচান-তবু নেই চাকরি, নেই সুরক্ষা
রফিকুল ঢালী কুলতলী
সুন্দরবনের টাইগার রেসকিউ টিমের দাবি—স্থায়ী নিয়োগ, স্বাস্থ্যবিমা ও সামাজিক নিরাপত্তা। জীবন বাজি রেখে কাজ করেও দুর্ঘটনার পর মিলছে না পর্যাপ্ত সহায়তা, অভিযোগ সদস্যদের।
সুন্দরবনে বাঘ লোকালয়ে ঢুকলেই বনদপ্তরের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে ওঠেন কালো পোশাক পরা টাইগার রেসকিউ টিম (QRT)-এর সদস্যরা। বাঘকে লোকেট করা, জঙ্গলে নেমে নেট ও ফেন্সিং করা, খাঁচা পাতা, প্রয়োজনে বাঘটিকে খাঁচাবন্দি করা কিংবা নিরাপদে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়া—সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলিই করেন তাঁরা। অথচ তাঁরা বনদপ্তরের স্থায়ী কর্মী নন; দিনমজুর হিসেবে দিনে এক হাজার টাকা মজুরিতে কাজ করেন।
শুধু সুন্দরবন নয়, প্রয়োজনে জেলার বাইরেও উদ্ধার অভিযানে যান এই সদস্যরা। গত বছর ওড়িশা থেকে ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি এলাকায় চলে আসা একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে উদ্ধার করতেও ডাকা হয়েছিল সুন্দরবনের এই দলকে। সেখানেও একই পারিশ্রমিকে জীবন বাজি রেখে অভিযান চালান তাঁরা।
কুইক রেসপন্স টিমের সদস্যদের অভিযোগ, আগে দিনে ৫০০ টাকা মিললেও বর্তমানে এক হাজার টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তুলনায় সেই পারিশ্রমিক অত্যন্ত সামান্য। আরও বড় অভিযোগ, অভিযানের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে বা কেউ গুরুতর আহত হলে তাঁদের জন্য নেই কোনও স্থায়ী ক্ষতিপূরণ, স্বাস্থ্যবিমা বা সামাজিক নিরাপত্তা।
এই অভিযোগের অন্যতম উদাহরণ গণেশ শ্যামল। টাইগার রেসকিউ টিমের এই সদস্য এক গ্রামবাসীর প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছিলেন। সেই অভিযানে তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং শারীরিকভাবে আগের মতো কাজ করার ক্ষমতাও হারান।
গণেশ শ্যামলের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি বনদপ্তর। যাদের হয়ে বছরের পর বছর জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন, সেই বনদপ্তরের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি বলেই দাবি তাঁর। বর্তমানে সংসারের হাল ধরেছেন তাঁর স্ত্রী। নদীতে মাছের ছোট পোনা (মীন) ধরে কোনওরকমে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সাহায্যের হাত বাড়ালেও সরকারি স্তরে প্রত্যাশিত সহযোগিতা মেলেনি বলে অভিযোগ পরিবারের।
টাইগার রেসকিউ টিমের সদস্যদের দাবি, বিগত সরকারকেও একাধিকবার স্থায়ী চাকরি, মাসিক বেতন, স্বাস্থ্যবিমা ও সামাজিক সুরক্ষার আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই দাবি পূরণ হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের কাছেও একই দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের বক্তব্য, "মানুষের জীবন বাঁচাতে আমরা বাঘের সামনে দাঁড়াই। কিন্তু আমাদের নিজেদের জীবন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ আজও অনিশ্চিত। সরকার আমাদের কাজের স্বীকৃতি দিক, স্থায়ী নিয়োগ, স্বাস্থ্যবিমা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।"