ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত পরিণতি, বন্ধুর ছুরির আঘাতে কিশোরের মৃত্যু; বারুইপুর হাসপাতালে বিক্ষোভ, রাতভর অবরোধ
*প্রদীপ কুমার সিংহ বারুইপুর*
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে তুচ্ছ বচসার জেরে এক কিশোরকে ছুরি মেরে খুনের অভিযোগে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মৃত কিশোরের বয়স ১৬ বছর। অভিযোগ, খেলাকে কেন্দ্র করে বিবাদের পর তিন বন্ধু মিলে তার বুকে ছুরি বসিয়ে দেয়। গুরুতর জখম অবস্থায় তাকে দ্রুত বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই ঘটনা পুলিশ পাঁচজনকে আটক করে।
ঘটনাটি ঘটেছে বারুইপুরের বিশালক্ষী তলায় পাল পাড়া এলাকায়। পরিবারের সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই কিশোর ফুটবলার সোমবার মাঠে খেলতে গিয়েছিল বিকেলে বাড়ি ফেরে। কিছুক্ষণ পরেই এক বন্ধু ফোন আসে, সঙ্গে সঙ্গে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় সন্ধ্যাবেলায়। কিছু বন্ধু অন্য জায়গা দাঁড়িয়ে ছিল তাদের মধ্যে একটা বচসা হয়েছিল সেই বচসার মীমাংসা করতে জয়। ওই ফুটবলার সেই এলাকায় গেলে তাদের মধ্যে বচসা শুরু হয়। প্রথমে কথা কাটাকাটি হলেও পরে তা হাতাহাতিতে গড়ায়। অভিযোগ, সেই সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে ১৬ বছরের ওই কিশোরের বুকে আঘাত করা হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও শেষরক্ষা হয়নি।
ঘটনার পর দ্রুত তদন্তে নেমে তিন অভিযুক্তকে আটক করে বারুইপুর থানার পুলিশ। এই তিনজনকে আটক করে প্রথমে বারুইপুর হাসপাতালে পুলিশ ক্যাম্পে রাখে। মৃত কিশোরের পরিবারের মানুষ দেখতে পেয়ে আটক তিনজনকে নিরাপত্তার স্বার্থে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে এসে একটি সুরক্ষিত কক্ষে রাখা হয়।
এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে ভিড় জমাতে শুরু করেন নিহত কিশোরের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযুক্তদের কঠোর শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। উত্তেজিত জনতা হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে আটক অভিযুক্তদের টেনে বের করারও চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। তবে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং বারুইপুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিরাপত্তা বলয় ভেঙে অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছতে পারেননি বিক্ষোভকারীরা।
পরিস্থিতি ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বারুইপুর হাসপাতালের সামনে কুলপি রোড অবরোধ করেন বিক্ষোভকারীরা। রাত সাড়ে ৯টা থেকে শুরু হওয়া অবরোধের জেরে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তার দু'ধারে আটকে পড়ে বহু যানবাহন এবং ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। প্রায় রাত ১২টা পর্যন্ত অবরোধ চলার পর পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।
উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় গোটা হাসপাতাল চত্বরে মোতায়েন করা হয় কয়েকশো পুলিশকর্মী ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান। হাসপাতাল এবং আশপাশের এলাকায় কড়া নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয় যাতে নতুন করে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছন বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বও। উপস্থিত ছিলেন বারুইপুর শহর মণ্ডলের সভাপতি গৌতম চক্রবর্তী এবং বিজেপির রাজ্য নেতা উত্তম কর। তাঁরা নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
হাসপাতালে পরিস্থিতি ভয়াবহ দেখে সেখানে আই জি প্রেসিডেন্সি কঙ্কর প্রসাদ বারুই,বারুইপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার অরবিন্দ কুমার আনন্দ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জোনাল পিনাকী দত্ত, ক্যানিং এসডিপিও রামকুমার মন্ডল, বারুইপুরে এসডিপিও অভিষেক রঞ্জন, কন্টাই য়ের এসডিপিও আতিশ বিশ্বাস সহ উচ্চ পর্যায় প্রশাসনে আধিকারিকরা এবং র্যাপ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী কর্মীরা উপস্থিত হয়। অবরোধকারীদের সঙ্গে বহুক্ষণ ধরেকথা বলেন আইজি প্রেসিডেন্সি কঙ্কন প্রসাদ বাড়ুই। অবরোধকারীদের দাবি ছিল ঘটনাস্থলে আরো দুজন বন্ধু ছিল তাদেরকেও আটক করতে হবে। সেই কথা অনুযায়ী পুলিশে গোয়েন্দা টিম গিয়ে রাতের বেলায় দুজনকে আটক করে।
পুলিশ জানিয়েছে, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে। কী কারণে সামান্য ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় এলাকাজুড়ে শোক ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার বারুইপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপারের অফিসে আসেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেখানে মৃত কিশোর খেলোয়াড়ের বাবা উপস্থিত ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী তাকে আশ্বাস দেন যারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেবেন এবং সেইসঙ্গে তার বাবাকে ১০ লক্ষ টাকা আর্থিক অনুদান দেবেন।