বাংলাদেশে ইলিশের আকাল: প্রজনন, সংরক্ষণ ও সুরক্ষা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ঢাকা থেকে বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ও সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন বাজারে বড় আকারের ইলিশের দেখা মিলছে না। জেলেদের অভিযোগ, সমুদ্র ও নদী—দুই জায়গাতেই আগের তুলনায় অনেক কম ইলিশ ধরা পড়ছে, যার জেরে বাজারে জোগান কমে গিয়ে দাম চলে যাচ্ছে সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শুধু উৎপাদন কমাই নয়, ইলিশের গড় ওজনও কমতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনের জন্য অশনিসংকেত। মৎস্য অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)-এর তথ্য বিশ্লেষণে ধরা পড়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির গতি স্তিমিত হয়ে এসেছে। বাজারে ছোট আকারের ইলিশের জোগান নাই। অন্যদিকে ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে বড় ইলিশ। গবেষকদের আশঙ্কা, এর প্রভাব পড়তে পারে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন চক্রেও।বাংলাদেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ইলিশ উৎপাদনের প্রায় ৭৫ শতাংশই হয় বাংলাদেশে। ধারাবাহিক সংরক্ষণ কর্মসূচির সুবাদে গত এক দশকে দেশে ইলিশ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল বলে জানাচ্ছে সরকারি হিসাব। মা ইলিশ সংরক্ষণ, জাটকা নিধন রোধ, সমুদ্রে ৬৫ দিনের মাছ ধরা নিষিদ্ধকরণ এবং জেলেদের খাদ্য সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের মতো উদ্যোগ সেই সাফল্যের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই ইতিবাচক ধারাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, উৎপাদন কমার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কারণ শুধু মাছের সংখ্যা নয়, বড় ইলিশের সংখ্যা কমে যাওয়াও ভবিষ্যৎ প্রজননের ক্ষেত্রে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিএফআরআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ সারা বছরই কমবেশি ডিম ছাড়ে, তবে প্রধান প্রজনন মৌসুম সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, বিশেষত আশ্বিন মাসের প্রথম পূর্ণিমার সময়। একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী ইলিশ তিন লাখ থেকে ২১ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। ডিম ছাড়ার ২২ থেকে ২৬ ঘণ্টার মধ্যে পোনা জন্ম নেয় এবং পাঁচ থেকে সাত মাস নদীতে বেড়ে ওঠার পর তারা আবার সাগরে ফিরে যায়। সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার আকারের স্ত্রী ইলিশ প্রজননক্ষম হয়ে ওঠে। প্রজনন নিরাপদ রাখতে সরকার নির্দিষ্ট সময়ে নদ-নদীতে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। আশ্বিনের পূর্ণিমার আগে-পরে মিলিয়ে অক্টোবর-নভেম্বরে সাধারণত ২২ দিন মা ইলিশ শিকার নিষিদ্ধ থাকে, আর মার্চ-এপ্রিলে জাটকা (ছোট ইলিশ) সংরক্ষণে সব ইলিশ ধরাই বন্ধ রাখা হয়। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একযোগে কাজ করছে একাধিক কারণ। সবচেয়ে বড় সমস্যা জাটকা ও মা ইলিশ নিধন। বড় হওয়ার আগেই বিপুল পরিমাণ জাটকা ধরা পড়ায় প্রাকৃতিকভাবে পূর্ণবয়স্ক ইলিশের সংখ্যা কমছে, আবার প্রজনন মৌসুমেও মা ইলিশ শিকার পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় ডিম ছাড়ার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নদীর নাব্য-সংকট। পলি জমে চর জেগে ওঠায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ এবং নদীর পানির মানের অবনতি ইলিশের আবাসস্থলকে ফেলছে ঝুঁকির মুখে। উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীতে বাড়ছে লবণাক্ততা, যা ব্যাহত করছে ইলিশের স্বাভাবিক অভিপ্রয়াণ (মাইগ্রেশন)। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, নদীপ্রবাহে পরিবর্তন ও তাপমাত্রার তারতম্যও প্রভাব ফেলছে প্রজনন-পরিবেশে।
প্রসঙ্গত, বিএফআরআই-এর তথ্য বলছে, একটি ইলিশ প্রতিদিন স্রোতের বিপরীতে প্রায় ৭১ কিলোমিটার পর্যন্ত চলাচল করতে সক্ষম। বিশ্বের ১১টি দেশে ইলিশ পাওয়া যায়—বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। তবে বিশ্বে আহরিত মোট ইলিশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই ধরা পড়ে বাংলাদেশে। উৎপাদনের নিরিখে দ্বিতীয় স্থানে মিয়ানমার, তৃতীয় স্থানে ভারত। এক দশক আগে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ মিলত, সরকারি তথ্য বলছে এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় ১২৫টি উপজেলার নদীতে। তবে গবেষকদের মতে, শুধু ভৌগোলিক বিস্তৃতি বাড়লেই চলবে না, ধরে রাখতে হবে মাছের সংখ্যা ও গড় আকারও। ২০২৫ সালে বরিশাল সদর, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৮২ কিলোমিটার নদী এলাকাকে দেশের ষষ্ঠ ইলিশ অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছিল, লক্ষ্য ছিল জাটকা সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক প্রজনন বৃদ্ধি। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অভয়াশ্রমে নজরদারি ও আইন প্রয়োগ সবসময় কার্যকর হয় না, ফলে ঘোষণার সুফল মিলছে না প্রত্যাশামতো। মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, মৎস্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান বহু ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে জাটকা শিকার, অবৈধ জাল ব্যবহার ও নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না।
বরিশালের কীর্তনখোলা, মেঘনা ও সন্ধ্যা নদীতে মাছ ধরা জেলে সজল খাঁ ও মো. খলিল সিকদারের কথায় উঠে এসেছে বাস্তব চিত্র। তাঁদের ভাষ্য, ২০২৬ সালের শুরু থেকেই জালে পর্যাপ্ত ইলিশ উঠছে না, নদীতেও মিলছে না মাছ। তাঁদের যুক্তি, শুধু ব্যবসায়ীদের ঘাড়ে দাম বৃদ্ধির দায় চাপানো ঠিক নয়—আসল কারণ জোগান-সংকট। অর্থনীতির প্রচলিত সূত্র অনুযায়ী চাহিদা বেশি ও জোগান কম হলে দাম বাড়বে, ইলিশের বাজারেও এখন সেই ছবিই স্পষ্ট। সমুদ্র উপকূল কুয়াকাটার জেলেদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মৌসুম শুরুর আগেই বিপুল পরিমাণ জাটকা ধরে ফেলা হয়। এই মাছগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পেলে কয়েক মাস পরই পূর্ণাঙ্গ ইলিশ হয়ে নদীতে ফিরত এবং উৎপাদন বাড়ত উল্লেখযোগ্যভাবে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্রের কারণে সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি। কঠোর নজরদারি, আইনের কড়া প্রয়োগ ও সংরক্ষণ কর্মসূচির কার্যকর রূপায়ণের দাবি জানিয়ে আসছেন সাধারণ জেলেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সম্পদই নয়, বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও খাদ্যাভ্যাসেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। উৎপাদন হ্রাসের বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে একটি ঐতিহ্যবাহী জাতীয় সম্পদও। তাঁদের মূল্যায়ন, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কঠোর সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং জেলে সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেই কেবল ইলিশের টেকসই ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা সম্ভব।